মাও (মো: ইকবাল হোসেন)

সবসময়ের মত সেদিনও রাত ১০ টার দিকে নির্জন ভোলাগীরির রোড এ হাটছিলাম। সাথে ছিল আক্তার স্যার ও এডভোকেট শাহিনুল ইসলাম তুষার। তবে ,সেদিন রাস্তাটিতে ক্ষনে ক্ষনে মানুষের আনাগোনা ছিল।সংকরমঠে অনুষ্টান থাকায় মানুষ পুজা শেষে সপরিবারে ফিরছিল। হঠাত খেয়াল করলাম , একটি কিশোর বয়সী সাদাকালো ডোরার বিড়াল নেচে নেচে একটি পরিবারের পিছন পিছন আসছিল। বিড়ালটি তাদের ছোট ছেলের সাথে খেলছিল। বিড়াল ছানাটি কিছুটা আক্রমানাত্মক মোডে থাকায় ছেলেটির বাবা বারবার তাড়িয়ে দিচ্ছিলো। আমি লোকটিকে জিজ্ঞেস করলাম, ` এটা আপনাদের পোষা নয়? “ তিনি বললেন , ‘না “। শুনে আমি খুব খুশি হলাম। যেন আকাশের চাদ হাতে পেলাম। কারণ,আমি পালার জন্য ঠিক যেমন বিড়াল ছানা খুজছিলাম।এ ছানাটি তার সব শর্ত পূরণ করে।দেরি না করে মাকে ফোন করলাম, একটা ছালার বস্তা নিযে রাস্তার পাশে দাড়াতে। আমি বিড়ালটিকে নানাভাবে লিড দিয়ে আমাদের বাসার সামনে নিয়ে আসলাম।সে খুব দুষ্ট ছিল বলে ধরতে ভয় হচ্ছিল। বস্তা দিয়ে ধরে সিড়ির গোড়ায় রাখতেই দেীড়ে দুতলার ঘরে পরিচিত ঘরের ন্যায় উঠে গেলো।তারপর থেকে আমাদের ঘরে তার এপিক জীবন শুরু হলো।আমার মা তাকে ফার্মের মুরগীর গুশত সিদ্ধ করে খেতে দিয়ে ক্ষান্ত হতো না ,বাজার থেকে তার জন্য বিড়ালের বিশেশায়িত খাবার কিনে আনতেন।মানব শিশুর মত তার জন্য আলাদা প্রস্রাব ও পায়খানার জায়গা নির্মান করে দেন। প্রতিদিন তার প্রস্রাবের ও ঘুমানোর বাক্স রোদে শুকাতেন । দিনে একবার শ্যাম্পু দিয়ে গোসর করাতেন। অপরিষ্কার মনে হলে ভেজা তোয়ালে দিয়ে ঘষে, মেঝে পরিষ্কার করে দিতেন।এভাবে মায়ের সাথে বিড়ালটির আত্মার সম্পর্ক গড়ে উঠে।তাকে ঘুম পাড়াতে,খাবার দিতে মানব শিশুর মত ব্যাবহার করতেন। পাশের বাড়ির একটি পোষা বিড়ালের আদুরি নামের অনুকরনে তার নাম রাখা হয় “ মাধুরি “। যদিও ফারাবি তাকে মাতুরি বলে ডাকতো আর আমি মাও বলে ডাকতাম।ধীরে ধীরে নানা মানবীয় আচরণের মাধ্যমে মাধুরি সবার হৃদয় জয় করে নেয় এবং আত্মার সাথে মিশে যেতে লাগলো। মাধুরির “মাও” ডাকটি আমার মায়ের কাছে সন্তানের ‘মা‘ ডাকের মত শোনাত।মাধুরি সারাক্ষণ মায়ের আশেপাশে ঘোরাফেরা করতো আর নানা কসরত করতো। একবার ভুলক্রমে মাধুরির ধারালো নখের আচড়ে মাকে ফেীজদারহাট গিয়ে ৩ টি ভ্যাকসিন মারতে হযেছিল। খুব বেশি বিরক্ত করলে ছিছের শলার ভয় দেখালে এমনভাবে দেীড়ে পালাতো যে, দেখে সবাই হাসতো।ভাতিজা ফারাবির সাথে তার খুব সখ্য গড়ে উঠে। ফারাবিকে আচড় দিতে পারে এই ভযে একবার মাধুরিকে অন্যের কাছে পালতে রেখে আসা হলো। তারপর সবার এমন ভাব হলো যেন, কোন মহামূল্যবান ধন হারিয়ে ফেলেছিল। স্কুল থেকে ফিরে এসে মাধুরিকে না দেখে আমার বুকটা হাহাকার করে উঠলো্। মাকে বললাম, কালই ভ্যাকসিনের টাকা দিবো ,মাধুরিকে নিয়ে আসেন। মাধুরিকে নিয়ে আসার পর সমস্ত ঘর আবার আনন্দে ভরে উঠলো।রাস্তায় বের হয়ে ময়লা নিয়ে বিছানায় আসবে বা গাড়ির নিচে পরতে পারে ,এ ভয়ে তাকে দিনে ছাদে এবং রাতে তার বাসার পাশে প্রায় বেধে রাখা হতো। দুরন্ত মাধুরীর এ বন্দী জীবন পছন্দ হতোনা। সে সুযোগ পেলে বের হওয়ার সুযোগ খুজতো। কিন্তু ২৩/০১/২০২৩ ইং মাকে ফাকি দিয়ে বাহিরে বেরিয়ে গেলো। অন্যদিন কিছুক্ষন পর নিজে নিজে ফিরে আসলেও আজ আর আসছেনা দেখে মা তাকে খুজতে বের হলেন। অনেক্ষন পর দখেলেও অনেক চেষ্টা করেও তাকে ফিরাতে ব্যার্থ হলেন। মায়ের অবাধ্য হয়ে বারবার দূরে সরে যাচ্ছিল। মা ,ফিরে এসে যোহরের নামাজের জন্য দাড়িয়ে এক রাকাত আদায়ের পর আদরের মাধুরির মরণ আঘাতের চিৎকার শুনতে পেলেন। পরপর দু বার! রাস্তা পার হয়ে ফিরে আসার পথে মাধুরিকে আক্রমণ করলো কুকুররুপি ৩ আজরাইল। ঘরপোষা অনভিজ্ঞ মাধুরি আত্মরক্ষার সুযোগ পেলোনা। তার নরম দেহের ঠুনকো পাজর শক্তিশালি দাতের চাপে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেলো। মুমুর্ষু মাধুরিকে পথচারিরা বাচাতে চেয়েও বাচাতে পারেনি। তাকে মুখে করে নিয়ে ডাস্টবিনের কাছে নিয়ে তার মৃতবৎ দেহটা রেখে চলে গেলো কুকুর আজরাইল।পরিমরি করে ছুটে গিয়ে মা তাকে খুজে পেলোনা। পরে, দূরে গিয়ে ডাস্টবিনের পাশে পরে থাকা মাধুরিকে খুজে পেল।মাধুরি তখন হালকা চোখ মেলে মাও মাও সব্দে মাকে ডাকছিল আর বোঝাতে চাইছিলো, “ মা ,আমি আজ প্রাণ দিয়ে বুঝতে পারলাম ,কেনো তুমি আমায় বেধে রাখতে। “ তার কাতর কন্ঠ তীর হয়ে মায়ের কলিজা এফোড় –ওফোড় করে দিচ্ছিলো।বুক ফেটে কলিজাটা যেন তার বেরিয়ে আসছিল। ড্রেনের ময়লা মাখা মাধুরির ৯৮% মৃত শরীরটা নিয়ে অবুজের মত এদিক ওদিক ছুটছিল। ডাক্তারের কাছে যাওয়ার রিকশা না পেয়ে পায়ে হেটে যাচ্ছিলেন। কিন্তু পরক্ষনেই বুঝতে পারলেন ,অনেক দেরি হয়ে গেছে! মাধুরির বাচার আর সুযোগ নেই। দুদিন ধরে নাওয়া খাওয়া ছেড়ে দিয়ে কান্না করলো মাধুরির মা ও আত্মার আত্মীয়রা।

Comments

Popular posts from this blog

A Thirsty Crow